Search
Close this search box.

শনিবার- ৫ই এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

বিচার: এক অনন্য দৃষ্টান্ত

বিচার: এক অনন্য দৃষ্টান্ত

সিরিয়ার একটি শহর রাকা। সেখান থেকে খলিফা হারুনুর রশিদের দরবারে একটি চিঠি পৌঁছালো। চিঠিতে লেখা ছিল: শহরের বিচারক দীর্ঘ এক মাস যাবত অসুস্থ থাকায় বিচারকাজ স্থগিত রয়েছে। খলিফা যেন দ্রুত ব্যবস্থা নেন।

খলিফা দ্রুত জবাব পাঠালেন—আগামী সপ্তাহের মধ্যে নতুন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হবে। ঠিক এক সপ্তাহ পর নতুন বিচারক এসে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। বিচারকাজ পুনরায় শুরু হলো।

একদিন শহরের প্রহরীরা এক বৃদ্ধা মহিলাকে আসামি হিসেবে দরবারে হাজির করল। তার অপরাধ ছিল—তিনি এক রেস্তোরাঁ থেকে কিছু রুটি ও মধু চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছেন।

বিচারক বৃদ্ধাকে জিজ্ঞাসা করলেন,

— আপনি চুরি করেছেন?

— জি হুজুর।

— আপনি জানেন, চুরি করা বড় অপরাধ?

— জি, জানি।

— তবুও কেন চুরি করলেন?

বৃদ্ধা অসহায় কণ্ঠে বললেন,

— আমি ও আমার এতিম দুই নাতি এক সপ্তাহ ধরে না খেয়ে আছি। ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে বাধ্য হয়েছি চুরি করতে।

বিচারক দরবারে উপস্থিত সকলের দিকে তাকালেন এবং বললেন, “আগামীকাল নগর প্রধান, খাদ্যগুদাম প্রধান, পুলিশ প্রধান ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা যেন উপস্থিত থাকেন। এরপর রায় ঘোষণা করা হবে।”

পরদিন

পরদিন সকালে সবাই হাজির হলে বিচারক রায় ঘোষণা করলেন, “বৃদ্ধা মহিলার চুরির অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তাই তাকে ৫০টি চাবুক ও ৫০০ দিনার রৌপ্য মুদ্রা জরিমানা করা হলো। অনাদায়ে তাকে এক বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে অকপটে সত্য বলার কারণে তার হাত কাটা হবে না।”

বিচারক প্রহরীদের চাবুক আনার নির্দেশ দিয়ে নিজেই বৃদ্ধার পাশে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন,

“যে নগরে একজন বৃদ্ধা ক্ষুধার তাড়নায় চুরি করতে বাধ্য হয়, সেখানে সবচেয়ে বড় অপরাধী হলেন খলিফা। আর আমি তার প্রতিনিধি। সুতরাং, এই অন্যায়ের অংশীদার আমিও। তাই ৫০টি চাবুকের ২০টি আমাকে মারা হোক।”

বিচারকের নির্দেশ অনুযায়ী তাকে ২০টি চাবুক মারা হলো। রক্তাক্ত হাতে তিনি রুমাল বের করে নিজেই ক্ষতস্থান চেপে ধরলেন। কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলে তিনি নিষেধ করলেন।

এরপর বিচারক বললেন,

“যে নগরে নগর প্রধান, খাদ্যগুদাম প্রধান ও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা একজন বৃদ্ধাকে অনাহারে রাখে, সে সমাজের সবাই অপরাধী। তাই বাকি ৩০টি চাবুক সমানভাবে তাদের উপরে প্রয়োগ করা হোক।”

এরপর বিচারক তার পকেট থেকে ৫০টি রৌপ্য মুদ্রা বের করে বললেন,

“যে সমাজ একজন বৃদ্ধাকে চোর বানায়, সে সমাজের সবাই অপরাধী। তাই উপস্থিত সবাইকে ১০০ দিনার রৌপ্য মুদ্রা জরিমানা করা হলো।”

মানবিক বিচার

জরিমানার ৫০০ দিনারের মধ্যে ১০০ দিনার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রাখা হলো। দোকানদারের ক্ষতিপূরণ বাবদ ২০টি মুদ্রা তাকে প্রদান করা হলো। বাকি ৩৮০টি মুদ্রা বৃদ্ধার হাতে তুলে দিয়ে বিচারক বললেন,

“এগুলো আপনার ভরণপোষণের জন্য। আগামী মাসে আপনি খলিফা হারুনুর রশিদের দরবারে যাবেন, তিনি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থী। ”

খলিফার ক্ষমাপ্রার্থনা

এক মাস পর বৃদ্ধা খলিফার দরবারে উপস্থিত হলেন। তিনি দেখলেন, সেদিনের সেই বিচারকই খলিফার আসনে বসে আছেন। খলিফা উঠে এসে বৃদ্ধার সামনে দাঁড়ালেন ও বললেন,

“সেদিন বিচারক হিসেবে আমি আপনার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম। আজ খলিফা হিসেবে আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। এই অধম খলিফাকে ক্ষমা করুন।”

এই ঘটনা বিচার ব্যবস্থার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

আরও পড়ুন

সম্পর্কিত আরো খবর

জনপ্রিয়