
সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলে গড়ে ওঠা উচ্চাভিলাষী মেগা প্রকল্প ‘দ্য লাইন’ এখন বড় ধরনের পুনর্বিবেচনার মুখে। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি)-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, প্রকৌশলী ও স্থপতিরা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশে তৈরি পরিকল্পনা থেকে ব্যাপক কাটছাঁট করছেন, কারণ প্রকল্পটি ‘বাস্তবসম্মত নয় এবং অতিমাত্রায় ব্যয়বহুল’ বলে অভ্যন্তরীণভাবে স্বীকার করা হচ্ছে।
‘দ্য লাইন’ মূলত সৌদি আরবের নিওম মেগা প্রকল্পের কেন্দ্রীয় অংশ, যার দৈর্ঘ্য ১৭০ কিলোমিটার এবং উচ্চতা পরিকল্পিত ছিল ৫০০ মিটার। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিশাল কাঠামো বাস্তবে নির্মাণ করা অত্যন্ত কঠিন। তবু যুবরাজ নিজের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে চাননি।
প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে ২০টি মডিউল তৈরির কথা থাকলেও ২০২৩ সালের মধ্যে তা কমিয়ে আনা হয়েছে মাত্র তিনটিতে। ইতিমধ্যে প্রকল্পে ৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, “এটি বিনিয়োগযোগ্য নয়। পরিকল্পনার প্রতিটি স্তরেই বাস্তবতার সঙ্গে সংঘাত রয়েছে।”
এফটির প্রতিবেদনে বলা হয়, নিওমের অভ্যন্তরে ভয়ের সংস্কৃতি বিরাজ করছে। যুবরাজের নির্দেশে কেউ প্রশ্ন তোলার সাহস পান না। পরিকল্পনা প্রদর্শনীর সময় সবাই বাধ্য হয়ে তাঁর সিদ্ধান্তে সায় দেন।
বিতর্ক ও মানবাধিকার উদ্বেগ
শুরু থেকেই ‘দ্য লাইন’ প্রকল্প গ্রাম উচ্ছেদ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সমালোচিত। কায়াল ও আল-খুরাইবা নামের দুটি গ্রাম থেকে স্থানীয় জনগণকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়। এতে হুয়াইতাত গোত্রের অন্তত ৫০ জন সদস্যকে আটক এবং পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া শ্রমিকদের প্রতি অমানবিক আচরণ ও কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগও উঠেছে। একটি নির্মাণকেন্দ্রে দুর্ঘটনায় পাকিস্তানি প্রকৌশলী আবদুল ওয়ালি ইস্কান্দার খানের মৃত্যু হয়, যার তদন্ত বা ক্ষতিপূরণ কোনোটি-ই হয়নি।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব তাদের ৯২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের সার্বভৌম তহবিলের বিনিয়োগ নীতিতে পরিবর্তন আনছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নিওম ও দ্য লাইন প্রকল্প এখন অগ্রাধিকারের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সৌদি সরকার এখন রিয়েল এস্টেটের বদলে লজিস্টিকস, খনিজ সম্পদ, ধর্মীয় পর্যটন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সেন্টার খাতে বিনিয়োগে মনোযোগ দিচ্ছে। গত জুলাইয়ে নিওমে প্রায় এক হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনাও সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘দ্য লাইন’ সৌদি যুবরাজের ভবিষ্যৎ–দর্শনের প্রতীক হলেও বাস্তবতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে প্রকল্পটি ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।





















