গুমের ভয়, নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষা আর গোপন বন্দিশালার অধ্যায় আর ফিরবে না-এমন দৃঢ় বার্তা দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না।
রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। গুমের কারণে শুধু একজন মানুষই নিখোঁজ হন না, তার পুরো পরিবারকে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা ও কষ্টের মধ্যে থাকতে হয়।
নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় থাকা মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী ও সন্তানদের কথা স্মরণ করে আবেগঘন বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, অনেক পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় থেকেছে। কারও শৈশব কেটেছে বাবার অপেক্ষায়, আবার কেউ স্বামীকে হারিয়ে একাই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন।
‘অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক, বিচার হবে’
গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, অপরাধী যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি জানান, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতা-কর্মীদের বেছে বেছে গুম ও গোপনে হত্যার অভিযোগও তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন গুমের ঘটনা খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে বিচার ও প্রতিকারের পথ এখনো অনেক দীর্ঘ।
পরিবারগুলোর দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে
শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না বলে মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল।
তিনি বলেন, বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোকে আর্থিক সংকট, মানসিক যন্ত্রণা ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এসব পরিবারের চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা, সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি জানান, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদেও স্বাক্ষর করেছে।
‘ভয়ের সংস্কৃতি নয়, থাকবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’
রাষ্ট্রপতি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না।
তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে।
দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে বিচার করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নাগরিক কতটা নিরাপদ, মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করছেন এবং রাষ্ট্র কতটা ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক-এসব বিষয়ও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।
বক্তব্যের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না।’
তিনি আরও বলেন, কোনো মাকে সন্তানের জন্য কিংবা কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য আর চোখের পানি ফেলতে হবে না-এমন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
গুম ও বিচারহীনতার অন্ধকার পেরিয়ে বাংলাদেশ সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি।