বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তফসিল ঘোষণার প্রাক্কালে তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশন যখন ৮ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করতে যাচ্ছে, তখনই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী যাত্রায় প্রবেশ করতে প্রস্তুত। যদিও দীর্ঘদিনের বিতর্ক, আস্থা সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার অভিজ্ঞতা নতুন তফসিলকে ঘিরে জনগণের মনে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে; তবে এবার পরিবর্তনের প্রত্যাশা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
এদিকে নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণের সময় বৃদ্ধি এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনার নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করে যে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে, তা আস্থা পুনর্গঠনে সূচনাবিন্দু বলা যেতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো-তফসিল ঘোষণার পরই শুরু হবে কমিশনের প্রকৃত পরীক্ষার সময়। কারণ বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে আচরণবিধি লঙ্ঘন, অর্থের প্রভাব, শক্তিপ্রদর্শন কিংবা প্রশাসনিক পক্ষপাত-সবই অত্যন্ত পরিচিত চিত্র। ফলে নির্বাচনী মাঠ নিয়ন্ত্রণে কমিশনের দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজনীয়ই নয়, আবশ্যক।
তবে, গত তিনটি জাতীয় নির্বাচন যেভাবে বিতর্ক ও অনিয়মের নজির স্থাপন করেছে, তাতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনআস্থা তলানিতে নেমেছে। এই আস্থাহীনতার বোঝা বর্তমান ইসিকেই বহন করতে হচ্ছে। নতুন আরপিও সংশোধনের মাধ্যমে কমিশন অধিক ক্ষমতা পেলেও এর সঠিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগই প্রমাণ করবে প্রতিষ্ঠানটি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন কি না। সুতরাং, এখানে কোনো শিথিলতার সুযোগ নেই।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিভিন্ন দল ও জোট রাজনৈতিক সংস্কার এবং নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণার ওপর জোর দিচ্ছে। যদিও ‘সংস্কার আগে নাকি নির্বাচন আগে’-এই বিতর্ক রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিভাজন সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দলগুলোর মতে, পরপর কয়েকটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের প্রশ্নটি এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
এদিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নির্বাচনের জন্য বড় উদ্বেগ। অভ্যুত্থানের পর পুলিশি কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়া, জেল ভেঙে পালানো বা জামিনে বের হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পুনঃসক্রিয়তা, বিভিন্ন শহরে লক্ষ্যবস্তুতে হত্যাকাণ্ড—এসবই নির্বাচনী নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তাই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে, রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরকার সংঘর্ষও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তফসিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত যে কোনো সময় বড় ধরনের অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে-এ কথা নতুন করে বলার নয়।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এখন অনিবার্য। নির্বাচন কমিশন গঠনের নিয়ম, প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই, প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তির দমন, নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে কঠোর আইন, পর্যবেক্ষক সংস্থার ভূমিকা-সব ক্ষেত্রেই সংস্কারের প্রয়োজন আছে। অতীতের ভুলগুলোকে স্বীকার করে সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়াই হতে পারে একটি নতুন ও আস্থাভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থার সূচনা।
সবশেষে বলা যায়—সুষ্ঠু নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা শুধু একটি রাজনৈতিক দাবি নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে আইনগত, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে সমন্বিত সংস্কার অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থাই পারে গণতন্ত্রকে টেকসই করতে-এটাই এখন বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার।