দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে দুই নেত্রীর হাত ধরে। তবে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটেছে একটি দীর্ঘ মেয়াদের। এই পরিবর্তনের হাত ধরে বাংলাদেশ তার শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে এক বিরল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর দেশ একজন পুরুষ সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে পরিচালিত হতে যাচ্ছে।
১৯৮৮ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পর থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনটি পর্যায়ক্রমে অলঙ্কৃত করেছেন বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা। মাঝে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানরা দেশ চালালেও নির্বাচিত কিংবা স্থায়ী সরকারপ্রধান হিসেবে কোনো পুরুষ এই পদে বসেননি।
১৯৮৮ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলের পর থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন কেবল দুই নারী—বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। যদিও এ সময়ে কয়েকবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ পরিচালনা করেছে, তবে নির্বাচিত বা স্থায়ী সরকারপ্রধান হিসেবে কোনো পুরুষ এই পদে অধিষ্ঠিত হননি।
১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৯৬ সালে স্বল্প সময়ের জন্য এবং ২০০১ সালেও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন এবং পরে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায় থেকে দেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এক দফা দাবি তথা শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সফল হয় ৫ আগস্ট তথা ৩৬ জুলাই। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিলে শূন্য হয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমানে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনা করছে।
যদিও বর্তমান সরকার একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা, তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে যে স্থায়ী সরকার গঠিত হবে, সেখানে বড় দলগুলোর নেতৃত্বের সমীকরণ বলছে-দীর্ঘ ৩৬ বছর পর কোনো পুরুষই পেতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর গদি।
দীর্ঘদিন পর শাসনব্যবস্থার এই পালাবদলকে কেন্দ্র করে জনমনে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। জনসাধারনের মতে, লিঙ্গীয় পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
বিগত ৩৬ বছর: ১৯৯১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত শাসন ক্ষমতা মূলত দুই নারী নেত্রীর হাতে ছিল। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর বর্তমান নেতৃত্বের কাঠামো অনুযায়ী, আগামী নির্বাচনে পুরুষ প্রার্থীদের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক বিবর্তন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এক বিশেষ ধারার অবসান হিসেবে দেখছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতারা নারীদের পূর্ণ সুজোগ সুবিধা দেওয়ার অঙ্গিকার করছেন। এখন দেখার বিষয়, এই নতুন নেতৃত্ব দেশের গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় কতটা সফল হয়।