-

ঝটিকা মিছিলের দায়ে চাপে পুলিশ, একই সময়ে ১১ কর্মকর্তার বদলি

ঝটিকা মিছিল
ছবি: সংগৃহীত

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ে চাপে পড়েছেন মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা। কোনো এলাকায় এমন মিছিল হলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও এলাকার ডিসিকে দায় নিতে হবে—ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এমন নির্দেশের পর পুলিশে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।

কর্মকর্তাদের একটি অংশ বলছেন, হঠাৎ কয়েকজন মিলে মিছিল বের করলে সেটি ঠেকানোর পুরো দায় ওসি বা ডিসির ওপর দেওয়া কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার এসবি প্রধানসহ অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদমর্যাদার ১১ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে।

সম্প্রতি পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কোনো এলাকায় আওয়ামী লীগের লোকজন ঝটিকা মিছিল করলে সেই দায় সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও এলাকার ডিসিকে নিতে হবে।

এরপর ঢাকার গুলশানে ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদকে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। এর আগে গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনকেও প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তবে বদলির আদেশে সরাসরি ঝটিকা মিছিলের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, ধরপাকড় ও নজরদারি বাড়ানোর পরও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিল পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এখন নতুন করে ধরপাকড় বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ চেকপোস্ট ও টহল বাড়িয়েছে। নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি বিশেষ নজরদারিও চলছে। পুলিশ, ডিবি ও সিটিটিসিসহ বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক বিষয়ে পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করা ঠিক নয়। তার মতে, রাজনৈতিক বিষয় রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করা উচিত। এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য বাড়িয়ে আগেভাগে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

পুলিশের সাবেক আইজিপি নুরুল হুদাও বলেছেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তাদের কর্মকাণ্ড ঠেকানোর দায়িত্ব পুলিশের। তবে শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর না করে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। কোনো এলাকায় মিছিল হওয়ার কারণেই সরাসরি কোনো কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়া ঠিক হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

পুলিশের মধ্যম সারির এক কর্মকর্তা বলেন, কয়েকজন মানুষ হঠাৎ একত্র হয়ে মিছিল করলে সেটি সব সময় ওসির পক্ষে ঠেকানো সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে পুলিশের মনোবল আরও কমে যেতে পারে বলে তার আশঙ্কা।

সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদার মতে, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ছিল কি না, তা দেখে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য বাড়িয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

### ১১ কর্মকর্তার বদলি

ঝটিকা মিছিল নিয়ে পুলিশের মধ্যে চাপের আলোচনা চলার মধ্যেই শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-১ শাখা থেকে পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদমর্যাদার ১১ কর্মকর্তাকে বদলি ও নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়।

রদবদলে পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিট বিশেষ শাখার (এসবি) নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। পুলিশ অধিদপ্তরের ডিআইজি মো. কামরুল আহসানকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে এসবির প্রধান করা হয়েছে। এসবির অতিরিক্ত আইজিপি সরদার নুরুল আমিনকে পুলিশ অধিদপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে।

ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. ইকবাল হোসেনকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশ অধিদপ্তরে নেওয়া হয়েছে। তার জায়গায় খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর পুলিশ অধিদপ্তরের ডিআইজি মো. রেজাউল করিমকে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক ডিআইজি মো. সায়েদুর রহমানকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশ অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের ডিআইজি মোহাম্মদ মুসলিম হয়েছেন কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের নতুন পরিচালক।

এ ছাড়া ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাইনুল হাসানকে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, সারদার প্রিন্সিপাল এবং সারদার প্রিন্সিপাল জি এম আজিজুর রহমানকে ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি করা হয়েছে।

এসবির ডিআইজি মীর আশরাফ আলীকে রেলওয়ে পুলিশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর মেট্রোরেলের ডিআইজি সিদ্দিকী তানজিলুর রহমানকে এসবির ডিআইজি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বদলির কারণ হিসেবে ‘জনস্বার্থে’ আদেশ জারির কথা বলা হয়েছে।

অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি প্রত্যাহার

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওকে কেন্দ্র করে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

অডিওটিতে এক ব্যক্তিকে নিজেকে ওসি পরিচয় দিয়ে সরকার, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনা করতে শোনা যায়। একইসঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ওসি পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করা হয়।

অডিওতে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পুলিশ কিছু করতে পারবে না—এমন বক্তব্যও রয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের দুর্বলতা এবং কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করা হয়।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের সই করা আদেশে রাকিবুল হাসানকে ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে অডিওতে থাকা বক্তব্যগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে ওসি রাকিবুল হাসানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন

সম্পর্কিত আরো খবর

জনপ্রিয়